Skip to main content

আদম (আ) পর্ব 10: কা'বিল ও হাবিল:

কা'বিল ও হাবিল:

বিশ্বে মানব বংশ বিস্তারের জন্য হযরত আদম (আ) এই নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন হযরত হাওয়ার গর্ভ থেকে যে জোড়া জোড়া সন্তান ভূমিষ্ঠ হত তাদের এক জোড়ার ছেলে মেয়েকে অন্য জোড়ার ছেলে মেয়ের সাথে বিবাহ
বন্ধনে আবদ্ধ করে দিতেন। এই নিয়মের অধীন কাবীল ও হাবীলের শাদীর ব্যাপারটি ছিল মীমাংসাধীন। কাবীল ছিল বয়সে বড় এবং তার সহোদরা ছিল হাবীলের সহোদরার চাইতে অধিক সুন্দরী। একারণে কাবীলের কাছে এটা খুবই অপছন্দনীয় ছিল প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী হাবীলের সহোদরার সাথে তার বিবাহ হোক এবং হাবিলের শাদী হোক তার (কাবীলের) সহোদরর সাথে। হযরত আদম (আ) বিষয়টির মীমাংসা করলেন এভাবে যে, তারা কাবিল ও হাবিল উভয়ে নিজ নিজ কুরবানী আল্লাহ তাআলার দরবারে উপস্থাপন করবে এবং যার কুরবানী গৃহীত হবে সেই আপন ইচ্ছা পূরণের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

তাওরাত থেকে জানা যায়, ঐ যুগে কুরবানী (মানত) কবুল হওয়ার এই ঐশী দস্তুর ছিল কুরবাণীর বস্তুকে কোন “উঁচু জায়গায় রেখে দেয়া হত এবং আকাশ থেকে এক খন্ড আগুন নেমে এসে তা ভষ্ম করে দিত। ঐ নিয়ম অনুযায়ী হাবীল তার পাল থেকে একটি মোটা তাজা দুম্বা আল্লাহর উদ্দেশ্যে মানত করল এবং কাবীল তার উৎপাদিত শস্য থেকে নিকৃষ্ট শ্রেণীর কিছু শস্য কুরবানীর উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করল। উভয়ের উপস্থাপনকৃত কুরবানী থেকেই তাদের সৎ বা অসৎ উদ্দেশ্যের হদীস পাওয়া গেল। কাজেই আগুন স্বাভাবিকভাবেই হাবীলের পেশকৃত মাংসটি ভষ্ম করে দিল এবং সার্থক হলো তার কুরবানী ।

কাবীল তার এই অবমাননাকে সহ্য করতে পারল না। সে রাগে একেবারে আগুন হয়ে হাবীলকে বলল, 'আমি তোকে অবশ্য অবশ্যই হত্যা করবো, যাতে তোর মনোবাঞ্ছা পূরণ না হয়'। হাবীল উত্তরে বললো, আমি তো কোন মতেই তোমার উপর হাত তুলবো না, অবশিষ্ট তোমার যা ইচ্ছা তাই করতে পারো। আর কুরবাণীর ব্যাপারে আমার বক্তব্য এ যার উদ্দেশ্যে সৎ, আল্লাহ তায়ালা তার কুরবানীই গ্রহণ করেন। এখানে সৎ উদ্দেশ্য পোষণকারীর ধমকিতে যেমন কাজ হয় না, তেমনি কাজ হয় না অযথা ক্রোধে। কাবীলের ক্ষেত্রে এই উপদেশ কিরূপ কাজ করলো। সে ক্রোধে একেবাগে সবরহারা হয়ে হত্যা করল আপন সহোদরকে। কিন্তু কুরআনে শাদী বা বিবাহ কাহিনীর কোন বর্ণনা নেই। শুধু কুরবানীর (মানুষের) বর্ণনা আছে। অবশ্য সেই সাথে হাবীলের মৃতদেহ দাফনের ঘটনাটিও বর্ণনা করা হয়েছে। হত্যাকান্ডের পর, মৃতদেহের কি করবে, সে চিন্তায় কাবীল একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়লো। তখন পর্যন্ত আদমের বংশের কেউ মৃত্যুমুখে পতিত হয়নি। তাই মৃত্যের সৎকারের ব্যাপারে আদম (আ) তখন পর্যন্ত আল্লাহর কোন নির্দেশ পাননি।

যাহোক হঠাৎ কাবীল দেখতে পেল, একটি কাক ঠোঁট দিয়ে ঠুকরিয়ে ঠুকরিয়ে জমিতে একটি গর্ত করে ফেললো। কাবীল তখন সজাগ হয়ে ভাবলো আমাকেও আমার ভাইয়ের জন্য এরূপ গর্ত খুঁড়তে হবে।
গর্ত খোঁড়ার পর কাকটি একটি মৃত কাককে টেনে এনে সে গর্তে মৃত্তিকা চাপা দিল। কাবিল এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর নিজের নিবুদ্ধিতার উপর আক্ষেপ করে বললো, আমি এই কাকের চেয়ে অধম। কেননা নিজের অপরাধ গোপন করার, এর সমপরিমাণ বিচক্ষণতাও আমার নেই। সে লজ্জা ও অপমানে মাথা হেট
করল। অতপর ঐ কাকের অনুকরণেই আপন সহোদরের মৃতদেহ মৃত্তিকাগর্ভেসমর্পন করলো।
“আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথ ভাবে শোনাও যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল তখন একজনের কুরবাণী গ্রহণ হল এবং অপরজনের গ্রহণ হল না। তাদের একজন বললো, আমি তোমাকে হত্যা করবোই।' অপরজন বললো, আল্লাহ সংযমীদের কুরবাণ গ্রহণ করেন। আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি হাত তুললেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি হাত প্রসারিত করব না, আমি তো বিশ্বজগতের প্রভু ভয় করি। তুমি আমারও তোমার পাপের ভার বহন কর এবং অগ্নিবাসী হও এটাই আমি চাই এবং অত্যাচারিদের কর্মফল।
অতপর তার চিত্ত ভ্রাতৃহত্যায় তাকে উত্তেজিত করল এবং সে তাকে হত্যা করলো। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হলো।
অতপর আল্লাহ এক কাক প্রেরণ করলেন, যে তার ভাইয়ের মৃতদেহ কিভাবে গোপন করা যায় তা দেখবার জন্য মাটি খুঁড়তে লাগল। সে বললো, 'হায়, আমি কি এই কাকের মতও হতে পারলাম না যাতে আমার ভাইয়ের মৃতদেহ গোপন করতে পারি!' অতঃপর সে অনুতপ্ত হলো। একারণেই বনি ইসরাইলের প্রতি এই বিধান দিলাম নরহত্যা অথবা পৃথিবীর ধ্বংসাত্মক কার্য করা হেতু ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকেই হত্যা করলো, আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলেসে যেন পৃথিবীর সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করলো।”
(সূরা ঃ মায়িদাহ, আয়াতঃ ২৭-৩২)

Comments

Popular posts from this blog

আদম (আ) পর্ব -01 হযরত আদম (আ) এর সৃষ্টি:

 হযরত আদম (আ) এর সৃষ্টি: আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আদম (আ) কে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা আদি মানব হযরত আদম (আ) কে দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানের মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। কাবা ঘরের মাটি দ্বারা মাথা, পাক-ভারতের মাটি দ্বারা পেট ও পিঠ, দুনিয়ার পূর্ব সীমান্তের মাটি দ্বারা দু হাত এবং পশ্চিম সীমান্তের মাটি দ্বারা দু'পা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর এক বর্ণনায় আছে, বইতুল মুকাদ্দাসের মাটি দ্বারা হযরত আদম (আ) এর মাথা বেহেশতের মাটি দ্বারা মুখমন্ডল, পাক-ভারতের মাটি দ্বারা দত্তরাজি, পবিত্র কাবার মাটি দ্বারা হস্তদয়, ইরাকের মাটি দ্বারা পৃষ্ঠদেশ, জান্নাতুল ফেরদাউসের মাটি দ্বারা কলিজা, তায়েফের মাটি দ্বারা জিহ্বা, হাউজে কাওছারের মাটি দ্বারা চক্ষুদ্বয়, পর্বতের মাটি দ্বারা মেরুদন্ড এবং বারেলের মাটি দ্বারাআদমের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরী করা হয়েছে। অন্য এক হাদিসে বর্ণিত আছে যে, তার মাথা মক্কা শরীফের মাটি দ্বারা, ঘাড় বাইতুল মুকাদ্দাসের মাটি দ্বারা, পেট ও পিঠ আদনের মাটি দ্বারা, হস্ত দ্বয় পাক-ভারতের মাটি দ্বারা, পদদ্ব...

আদম (আ)পর্ব 11: হযরত আদম (আ) এর ইনতিকাল:

হযরত আদম (আ) এর ইনতিকাল: হযরত আদম (আ) এক হাজার বছর বয়ক্রমকালে রোগশয্যায় পতিত হয়। ছেলেদেরকে বিভিন্ন প্রকার ফলফলাদি আনতে বলেন, যাতে সেগুলো খেতে পারেন। শীষ (আ) ব্যতীত আদম (আ) এর অন্যান্য ছেলেরা ফলফলাদি আনতে যায়, কিন্তু হযরত শীষ (আ) পিতার সেবায় নিয়োজিত থাকেন। আদম সন্তানদের যারা ফলফলাদি আনতে গিয়েছিল, তারা আসতে দেরী দেখে হযরত শীষ (আ) কে বললেন, তুমি অমুক পাহাড়ে গিয়ে প্রার্থনা কর, তাহলে মহান আল্লাহ তায়ালা তোমার দোয়ার বরকতে আমার জন্য ফলফলাদি পাঠিয়ে দিবেন। পিতার নির্দেশে হযরত শীষ (আ) পাহাড়ে গিয়ে দোয়া করেন। দোয়া শেষে দেখেন, হযরত জিবরাঈল (আ) একটি সোনালী রংয়ের রেকাবীতে করে ডুমুর, ডালিম, সেব, নারীঙ্গী, কমলালেবু, আঙ্গুর, আঞ্জির, খরমুজা প্রভৃতি ফল নিয়ে এসেছেন। জিবরাঈল (আ) কর্তৃক বেহেশত থেকে আনীত ফলফলাদির কিছু হযরত আদম (আ) খান এবং কিছু তার সন্তানদের দেন। এবার হযরত আদম (আ) সন্তানদের অন্তিম উপদেশ দিলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই আমি অস্থায়ী জগত থেকে চিরস্থায়ী জগতে চলে যাব। শীষ আমার স্থলাভিষিক্ত থাকবে। তোমরা সকলে তার আনুগত্য করবে এবং তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। তারা সকলে হযরত শীষ (আ) এর আনুগ...

আদম (আ) পর্ব 7: আদম (আ) কে চিরস্থায়ী জীবন থেকে বহিষ্কার

আদম (আ) কে চিরস্থায়ী জীবন থেকে বহিষ্কার এবার ইবলীসের হাতে একটা সুযোগ এল। সে আদম ও হাওয়ার অন্তরে এ মর্মে প্ররোচনা ঢেলে দিল এ বৃক্ষই ‘চিরস্থায়ী বৃক্ষ'। এর ফল ভক্ষণ করা মানে চিরদিন জান্নাতে অবস্থানের নিশ্চয়তা লাভ। সে কসম করে তাদেরকে এ মর্মে আশ্বস্ত করল সে তাদের মংগলাকাংখী; দুশমন মোটেই নয়। একথা শুনে হযরত আদম (আ) এর 'মানব সুলভ' মনমানসিকতায় ভ্রান্তির সংযোগ ঘটলো। তিনি ভুলে বসলেন, আল্লাহর উপরোক্ত নির্দেশ শুধু অভিভাবক সুলভ পরামর্শ নয় বরং নিষেধ সূচক একটি নির্দেশ। শেষ পর্যন্ত তাঁর জান্নাতে চিরস্থায়ী অবস্থান এবং আল্লাহর নৈকট্যে থাকার সংকল্পে শৈথিল্য দেখা দিল। তিনি ফল ভক্ষণ করলেন। সাথে সাথে তাঁর মানবিক বৈশিষ্ট্যতা প্রকাশ পেতে আরম্ভ করল। দেখলেন, তিনি বিবস্ত্র, পোশাক পরিচ্ছদ থেকে বঞ্চিত। সত্বর উভয়ে (আদম ও হাওয়া) গাছের পাতা দিয়ে লজ্জাস্থান ঢাকতে আরম্ভ করলেন। এখান থেকেই যেন মানব সভ্যতার সূচনা। কেননা তারা দেহ আচ্ছাদনের জন্য এই প্রথমবারের মত বৃক্ষের পাতা ব্যবহার করলেন। একদিকে এ ঘটনা, অপরদিকে আল্লাহ তাআলার শাস্তি নাযিলের সূচনা। আদম (আ) কে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘নিষেধ সত্ত্বেও কেন এ অমান্...